আজ বুধবার, ১৩ই ফাল্গুন, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ

বাল্য বিবাহ বন্ধে চেয়ারম্যান মেম্বারদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ

সংবাদচর্চা রিপোর্ট

কোথাও কোন বাল্য বিয়ে হলে প্রাথমিকভাবে দোষী হবেন ওই এলাকার চেয়ারম্যান মেম্বার কাউন্সিলরগন। তবে তাদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। তারা তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছেন না। প্রশাসনের ভ্রাম্যমান আদালতের ম্যাজিষ্ট্রেটগন বাল্য বিবাহ বন্ধে কোথাও কোথাও ভূমিকা রাখলেও জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে কোন ধরনের ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় নি।

গত বছর হাইকোর্টের একটি আদেশে প্রশাসনকে বাল্য বিবাহ সংগঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধিগন আসামী হবেন বলে একটি আদেশ জারি করলেও ১ বছর পেরিয়ে গেলেও তার বাস্তবায়ন হয় নি জেলার কোথাও। তবে এই আইন জনসাধারনের কী কাজে লাগলো।

শুধুমাত্র আদালত ও সংশ্লিষ্ট সকলের কর্মঘন্টার অপচয় ছাড়া আর কিছুই হয় নি। কেন প্রশাসন হাইকোর্টের আইন বাস্তবায়নে কোন ধরনের ভূমিকা রাখছে না এমন প্রশ্নের জবাব জানতে অনুসন্ধান চালানো হলে বেরিয়ে আসে বেশ কিছু তথ্য। যার মধ্যে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো প্রশাসনের কর্মকর্তাগন জনপ্রতিনিধিদের সমিহ করে কাজ করেন। জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া তাদের জন্য বড়ই দূরহ ব্যাপার!

নারায়নগঞ্জের ৬৩টি ওয়ার্ড, ১৩৩টি গ্রাম, ৭৪টি মহল্লায় কোথাও কোন বাল্য বিয়ে হলে চেয়ারম্যান ও মেম্বারকে দোষী করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। সিটি কর্পোরেশনে হলে ওয়ার্ড কাউন্সিলরকে দোষী করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের সাধারন মানুষকে আরও সতর্ক হতে হবে। চেয়ারম্যান, মেম্বার, কাউন্সিলর বা কোন জনপ্রতিনিধির নির্দেশে বাল্য বিয়ে হওয়া তো দূরের কথা তার নির্বাচনী এলাকায় কোথাও বাল্য বিয়ে হলে তাতে তিনি বাধা না দিলে বা আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীকে খবর না দিলে সেই জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আদেশ দেয় গত বছর হাইকোর্ট। বাল্য বিবাহ বন্ধে জনপ্রতিনিধিদের কার্যকর ভূমিকা রাখার প্রশ্নে রুল জারি করেছে হাইকোর্ট। রুলে প্রতিটি বাল্য বিবাহের জন্য সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিরা কেন দায়ী হবেন না এবং জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাদের বিরুদ্ধে কেন আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ তথা পদচ্যুত করা হবে না তা জানতে চাওয়া হয়। জনপ্রশাসন সচিব, স্থানীয় সরকার সচিব, আইন সচিব, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, সমাজকল্যাণ সচিবকে চার সপ্তাহের মধ্যে এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়।

বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ স্বত:প্রণোদিত হয়ে এই আদেশ দেন। আদালত বলেন, জনপ্রতিনিধিরা ‘অফিস’ নেবেন দায়িত্ব নেবেন না তা হবে না। বাল্য বিবাহ বন্ধে ভূমিকা রাখতে জনপ্রতিনিধিরা দায়বদ্ধ। আদালত বলেন, বাল্যবিবাহ হলে ইউনিয়ন পরিষদের ক্ষেত্রে ইউপি চেয়ারম্যান ও ওয়ার্ড মেম্বার এবং সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার ক্ষেত্রে ওয়ার্ড কমিশনাররা দায়ী থাকবেন। আদেশের এই অনুলিপি দেশের সকল জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং উল্লেখিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে পাঠাতে জনপ্রশাসন সচিব এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবকে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। এ সময় ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তাপস কুমার বিশ্বাস ও সহকারি অ্যাটর্নি জেনারেল তাইতাস হিল্লোল রেমা উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে ‘২৪ ঘন্টায় আট বাল্যবিবাহ বন্ধ’ শীর্ষক শিরোনামে শনিবার একটি জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রশাসনের হস্তক্ষেপ, কিশোরী কনে ও তাদের সহপাঠী এবং এলাকাবাসীর সচেতনতায় গত ২৪ ঘন্টায় বাল্যবিবাহ থেকে রেহাই পেয়েছে আট কিশোরী। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিট ২০১৩ সাল থেকে বাল্যবিবাহ বন্ধে কাজ শুরু করে। বিভাগীয় কমিশনারদের পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের ঘটনার হিসাব রাখে এই ইউনিট। গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিটের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ সালে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের ঘটনা ছিল ১৩ হাজার ৩৩৪টি। ২০১৫ সালে তা বেড়ে হয় ১৫ হাজার ৭৭৫টি। অবশ্য ২০১৬ সালে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের ঘটনা কমে আসে, ৬ হাজার ৩৮৯টি। জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) তথ্যমতে, যে দেশগুলোতে বাল্যবিবাহ বেশি, বাংলাদেশ অন্যতম।

২০১৫ সালে ইউনিসেফের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর করা জরিপের ফল অনুযায়ী, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী ৫২ শতাংশ নারীর ১৮ বছর পার হওয়ার আগেই বিয়ে হয়েছে।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র আইনজীবি এডভোকেট আজিজুর রহমান মোল্লা বলেন, অবিলম্বে বাল্য বিবাহ বন্ধ করতে হবে। আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে আমাদের আইনজীবিরা সাধারন জনগনের বিভিন্ন সমস্যা মহামান্য হাইকোর্টের সামনে তুলে ধরলেও জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা তা মেনে চলে না। প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুরা জীবনের ঝুকি নিয়ে সংবাদ পরিবেশনের পর আমরা তা থেকে আমাদের সমাজের বর্তমান হাল সম্পর্কে জানতে পারি।

তাই আমাদের সকলের সততার সাথে আমাদের কিশোরীদের জীবনকে সুন্দর করতে আরও জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে।