আজ বৃহস্পতিবার, ৬ই আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ২০শে জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

পাঁচের প্যাঁচঃ কার নজর কোথায়

নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে দ্বিতীয়বারের মত সংসদ সদস্য হিসেবে আছেন ব্যবসায়ী নেতা সেলিম ওসমান। তিনি জাতীয় পার্টি মনোনীত এমপি। এর আগে এই আসনে জাতীয় পার্টির মনোনয়নে এমপি হয়েছিলেন তারই বড়ভাই নাসিম ওসমান। ফলে দীর্ঘ প্রায় পনের বছর এখানে নৌকার প্রার্থী নেই। এ নিয়ে চরম ক্ষোভ ও হতাশ স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী।

সূত্র বলছে, প্রতি নির্বাচনের পূর্বেই স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারাই নৌকার প্রার্থী চেয়ে জোড় দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু জোটগত নীতির কারণে নারায়ণগঞ্জের দুটি আসন জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, জাতীয় পার্টিকে ছাড় দেওয়ার কারণে নারায়ণগঞ্জের ওই দুটি আসনে আওয়ামী লীগের অবস্থাও খুব নাজুক। সাংগঠনিকভাবেও দুর্বল হয়ে পড়েছে ক্ষমতাসীন এই দলটি। ফলে এবার তারা এ দুটি আসনে জাতীয় পার্টিকে ছাড় না দেওয়ার পক্ষে এককাট্টা হয়েছেন নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মী। তবে তাদের মধ্য থেকে সব থেকে বেশি জোড়ালো বক্তব্য দিচ্ছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনতা শহীদ মো. বাদল।

সম্প্রতি তিনি একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেছেন, নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসনেই আমরা নৌকা চাই। দরকার হলে এখানে যিনি আছেন তাকে নৌকায় নিয়ে আসার দাবি জানান। এর আগে বিভিন্ন সময় তিনি নৌকার প্রার্থী চেয়ে বিভিন্ন বক্তব্যও দিয়েছেন। গেল নির্বাচনের পূর্বেও একই দাবিতে তিনি অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেলিম ওসমান প্রশ্নে তিনি অনেকটা চুপসে যান। ফলে এবারও তিনি সেই একই দাবিতে জোড়ালো বক্তব্য দিচ্ছেন। তাই প্রশ্ন উঠেছে, শেষ পর্যন্ত তিনি তার এই অবস্থান ধরে রাখতে পারবেন কিনা। অথবা শেষ অবধি সেলিম ওসমানকে নৌকায় আসার যে আহŸান জানানো হয়েছে, বর্তমান এই সাংসদ নৌকায় যাবেন কিনা।

অপরদিকে একটি সূত্র বলছে, বিগত নির্বাচনের পূর্বেও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার জন্য বেশ তোড়জোর করেছিলেন আবু হাসনাত শহীদ মো. বাদল। শেষ পর্যন্ত আর সেটি হয়ে উঠেনি। তবে এরপর তিনি চুপসে যান নি। দ্বাদশ নির্বাচনকে টার্গেট করে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন কেন্দ্রিক আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলেন। পাশাপাশি এসব অঞ্চলে পূর্বের মতই যাতায়াত রক্ষা করেন। এতে করে স্পষ্ট হচ্ছে এবারের নির্বাচনেও তিনি প্রার্থী হবেন। সে লক্ষ্য নিয়ে তিনি কেন্দ্র থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায়েও কাজ করছেন। অনেকের মতে, ভিপি বাদলের মূল টার্গেটই নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে এমপি নির্বাচন করা। ফলে আপাত দৃষ্টিতে তার এই মনোনয়ন প্রাপ্তির অন্তরায় সেলিম ওসমান বলেই মনে করছেন অনেকে। কেননা, ওসমান পরিবারের সন্তান হচ্ছেন সেলিম ওসমান। ফলে ওসমান পরিবারের কারণেই এই আসনটি জাপাকে ছাড় দেওয়ার অন্যতম কারণ। এখানে সেলিম ওসমান প্রার্থী ছিলেন বলেই আওয়ামী লীগ নিজ দলের কোনো প্রার্থী দেয়নি। তাই এবারও শঙ্কা রয়েছে, সেলিম ওসমান নির্বাচন করলে আওয়ামী লীগ এবারও এই আসনে নৌকার কোনো প্রার্থী দিবে না।

এদিকে অতীতে সেলিম ওসমান বেশ ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন আবু হাসনাত শহীদ মো. বাদলের প্রতি। যার ফলশ্রæতিতে তাকে উদ্দেশ্য করে ‘সোজা মতলবে পাঠিয়ে দেয়া হবে এবং ল্যাতা হইছেন, সেলিম ওসমান এমন তীর্যক মন্তব্য করে বক্তব্যও রেখেছিলেন। পরে এসব বিষয়ে সমঝোতা হলেও এবার দলীয় প্রার্থীর দাবীতে আট ঘাট বেঁধেই মাঠে নেমেছেন বাদল।

সূত্রে মতে, নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে আলোচিতদের একজন আবু হাসনাত শহীদ বাদল। তিনি ছিলেন সরকারী তোলারাম কলেজের ভিপি। ছিলেন নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবলীগের সেক্রেটারী। বর্তমানে জেলা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারী হিসেবে দ্বীতিয়বারের মত নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এমপি শামীম ওসমানের হাত ধরেই রাজনৈতিক উত্থান হয় তাঁর। এছাড়াও তাঁরা ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কিন্তু বিগত জাতীয় নির্বাচন থেকেই শামীম ওসমানের বড় ভাই সেলিম ওসমান সম্পর্কে কদাচিৎ বক্তব্য রাখছেন ভিপি বাদল। আর তা নিয়েই হয়েছিল পাল্টাপাল্টি বাহাস।

এবার গত ১৬ জুলাই দলীয় কার্যালয়ে স্মার্ট কর্ণার উদ্বোধন অনুষ্ঠানের এক আলোচনা সভায় তিনি বলেছেন, কার এমন দু:সাহস হয় এখানে প্রার্থী দিবে। আমরা একটা জায়গায় বারবার একই প্রার্থী দেখি! পরিবর্তন হতে কি পারেনা। আমরা পরিবর্তন চাই। একই জায়গায় ইউপি নির্বাচন হলে প্রার্থী দেখা যায়। কিন্তু নৌকার দেখা যায় না। নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে আমরা যখন মনোনয়ন কিনি অনেকেই ভাবেন, এ আসনে মনোনয়ন কিনার দু:সাহস কারো নাই। দয়া করে নীতি টা পরিবর্তন করার অনুরোধ রইল।

প্রসঙ্গত, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে নৌকার প্রার্থীর দাবীতে একট্টা হয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এছাড়াও ভিপি বাদলের সাথে একমত পোষণ করে সেলিম ওসমানকে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করার আহŸান জানান জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সিনিয়র সহ সভাপতি এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীও। আর এ নিয়ে নতুন করে সেলিম ওসমান ও ভিপি বাদলকে ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে জেলার রাজনীতি। নির্বাচন এলেই এই আসনকে কেন্দ্র করে জাতীয় পার্টির মনোনিত প্রার্থী বর্তমান সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত মোহাম্মদ শহীদ বাদলের মধ্যে বাহাস লক্ষ্যনিয় হয়ে উঠে। যদিও এখন পর্যন্ত তেমন কোন পাল্টা বক্তব্যে মুখ খোলেননি সেলিম ওসমান।

তবে এ প্রসঙ্গে মুঠোফোন কথা হলে সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান বলেন, ‘নৌকা প্রতীকে কে করবে ইটস নট মাই জব। উনি (বাদল) যাই বলুক। আমি এই সব নিয়ে ভাবছি না।’

উল্লেখ্য, মহামারিকালে শহরের খানপুর এলাকায় ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে করোনা রোগীদের জন্য আইসিইউ ইউনিট উদ্বোধন উপলক্ষে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এমপি সেলিম ওসমান ভিপি আবু হাসনাত মোহাম্মদ শহীদ বাদলকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, রেলওয়ে হেড কোয়ার্টারে থাকতেন। একজন এমপি সাহেবের আশীর্বাদে ওনি বলে এখন লেতা (নেতা)। শুনি নাকি এখন লেতা। এ লেতা বন্দরে গিয়ে বললো, সেলিম ওসমান বন্দরের এমপি না। বন্দরের উপজেলা চেয়ারম্যান বন্দরের এমপি। প্রশ্ন থাকবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে, এমপি সিট বদলায় দিতে পারে এটি কি করে সম্ভব হতে পারে। দুই দিনের যোগি না ভাতেরে অন্য বইলেন না। আমরা দেশটা স্বাধীন করেছি। আমরা মুক্তিযোদ্ধা। হাজার বার বলি সেলিম ওসমানের থাবা বাঘের চেয়েও ভয়ংকর। বাঘের চেয়েও ভয়ংকর সেলিম ওসমানের থাবা।

তিনি আরো বলেছিলেন, মতলব থেকে এসে নেতা হয়েছেন। ধানমন্ডিতে অট্টালিকা করেছেন। কত টাকার মালিক হয়েছেন সেলিম ওসমান দেখিয়ে দিবে। দেখবো আপনি আমাকে সরাতে পারেন কি না। ওনাকে আবার মতলব ফিরে যেতে হবে। আপনি আওয়ামী লীগ করেন যাই করেন সেটা দেখার বিষয় না।

স্পন্সরেড আর্টিকেলঃ