আজ বৃহস্পতিবার, ৬ই আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ২০শে জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

নীরব শামীম ওসমান

স্টাফ রিপোর্টার :
নারায়ণগঞ্জবাসীর বাধার পরও শহরের কেন্দ্রীয় রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন জমি দখল করে কল্যাণ স্ট্রাস্টের নামে নির্মাণ করা হচ্ছে মার্কেট। যদিও এ মার্কেট নির্মাণের কারণে ড্যাপ ও কদমরসুল সেতুর মত সরকারি দুটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাঘাত ঘটবে। যা নগরবাসীর ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে বলে মন্তব্য সচেতন মহলের। প্রকল্পের গলার কাটা ও নাগরিক সমস্যা বিবেচনায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনও একাধিকবার মার্কেট নির্মাণের বিষয়ে আপত্তি জানান। কিন্তু তাতে কোনো তোয়াক্কা না করে নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে সংশ্লিষ্টরা। সম্প্রতি স্টেশন সংলগ্ন ওই জমিতে নির্মাধীন মার্কেটের ছাদ ঢালাই সম্পন্ন করতে দেখা যায়।
ওই সভায় মেয়র আইভী বলেছিলেন, এক নম্বর রেলগেট এলাকায় বিশাল বড় মার্কেট করছে রেলওয়ের প্রাক্তন কর্মচারীরা। শহরে আমরা মানুষদের জায়গা দিতে পারছিনা আর এর মধ্যে রেলওয়ের প্রাক্তন কর্মচারীদের জন্য ভবন করে মার্কেট বানানো হচ্ছে। যেখানে সরকারিভাবে মাল্টিমডেল হাব হবার কথা। নৌ মন্ত্রণালয়, যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন তিনটি প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে একটি বড় হাব হবে। যেখানে রেল স্টেশন, নৌ টার্মিনাল ও বাস টার্মিনাল থাকবে। সেটাকে তোয়াক্কা না করে এত বড় মার্কেট হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, চেষ্টা করছি সবার সাথে মিলে কাজ করার জন্য। কিন্তু এর মানেই এ না যে শহরে যে যা খুশি করবে। অন্যান্য সংস্থা এসেও তাই করবে। আমাদের অধিকার খর্ব করে নিজের জন্য ব্যবস্থা করবে আর নারায়ণগঞ্জের মানুষ চেয়ে চেয়ে দেখবে। এটাও হয় না। সকলে নিশ্চুপ, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নিশ্চিুপ না।
সে সময় তার বক্তব্যে সমর্থন জানিয়ে সংসদ সদস্য শামীম ওসমান বলেছিলেন, রেলওয়ের ঘটনা সম্পর্কে আমার জানা ছিল না। এটা যদি সমস্যা হয় এই সমস্যা নিয়ে আমরা সবাই মিলে যেতে পারবো। আমরা এর সমাধান করতে পারি।
সর্বশেষ চলতি মাসে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের এক ইফতার আয়োজনে এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন নাসিক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। সে সময় তার বক্তব্যে সমর্থন জানিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। সে সময় শামীম ওসমানের বক্তব্যে নির্মাণ কাজ বন্ধ করার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ পেলেও তা পরবর্তী সময়ে আর দেখা যায়নি। অন্যদিকে সময়ের সঙ্গে এগিয়ে চলছে রেলওয়ের মার্কেট নির্মাণ কাজ। ফলে এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে চলছে সমালোচনা। সংসদ সদস্যের একদিনে আগ্রহকে স্ট্যান্ডবাজী বলেও আখ্যায়িত করেছেন অনেকে।
তথ্যমতে, বাংলাদেশ রেলওয়ে (কর্মচারী) কল্যাণ ট্রাস্টের নামে ২০১২ সাল থেকে স্টেশন সংলগ্ন রেলওয়ের ৪৭ হাজার ২০০ বর্গফুট জমিতে একাধিকবার মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে প্রথম থেকেই মার্কেট নির্মাণের বিরোধীতা করে আসছে নারায়ণগঞ্জের সচেতন মহল। এক পর্যায়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী, কাউন্সিলর অসিত বরণ বিশ্বাস’সহ ৪ কাউন্সিলর এর বিরোধীতা করেন। তাদের বিরোধীতার মুখে সে সময় কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হয় সংশ্লিষ্টরা। পরবর্তীতে ২০২২ সালের আগস্ট মাসে ‘নারায়ণগঞ্জ রেলওয়ে শপিং কমপ্লেক্স-৩’ নামে পুনরায় মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। সচেতন মহল মহল ফের এর প্রতিবাদ জানিয়েছে একাধিক সভা, সমাবেশ ও মানববন্ধন করে। এর ফলে পুনরায়ন কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হয় সংশ্লিষ্টরা। তবে গত ফেব্রুয়ারি মাসের দিকে ফের মার্কেটের নির্মাণ কাজ করতে দেখা যায়।
গতকাল দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, পুরো জমি জুড়ে দাঁড় করানো হয়েছে মার্কেটের কাঠামো। মার্কেট নির্মাণে কাজ করছে ১৫ থেকে ২০ জন নির্মাণ শ্রমিক। কেউ ইট বহন করছে, কেউ ইট-বালু মিসাচ্ছে, কেউ কেউ ব্যস্ত ইটের গাঠুনি দিতে। এ সময় কর্মরত একাধিক নির্মাণ শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানান যায়, বিগত কয়েকমাস যাবৎ চলছে মাকের্ট নির্মাণ কাজ। সম্প্রতি মার্কেটের প্রথম তলার ছাদ ঢালাই কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে (কর্মচারী) কল্যাণ ট্রাস্ট সূত্রে জানা যায়, কল্যাণ ট্রাস্ট তার তহবিল বৃদ্ধির লক্ষ্যে রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ের অনুমতিক্রমে বিভিন্ন স্থানের রেলভূমির লাইসেন্স গ্রহণ করে সেখানে মার্কেট নির্মাণ করে। তারই ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালের ৮ জুলাই নারায়ণগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন কলোনী সংলগ্ন রেলওয়ের অব্যবহৃত ৪৭ হাজার ২০০ বর্গফুট জমি বাংলাদেশ রেলওয়ে (কর্মচারী) কল্যাণ ট্রাস্টের নামে লাইসেন্স গ্রহণ করা হয়। তহবিল বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই জমিতে মার্কেট নির্মাণ করতে চায়।
রেলওয়ে কর্মচারীদের কল্যাণে মার্কেট নির্মাণ করার কথা বললেও এ প্রকল্পের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ রেলওয়ের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী সম্পৃক্ত নন বলে জানান নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় স্টেশন মার্কেট কামরুল ইসলাম। তিনি বলেন, উচ্ছেদ অভিযানে আমাদের চিঠি দেয়া হয়েছিল তাই আমরা সে সময় ছিলাম। কিন্তু এ প্রকল্পের কোথাও আমাদের কারো সম্পৃক্ততা নেই এবং এই মার্কেটে আমাদের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর নামে কোনো দোকানও নেই।
অন্যদিকে নির্মাণাধীন ‘নারায়ণগঞ্জ রেলওয়ে শপিং কমপ্লেক্স-৩’ এর তত্ত্বাবধায়ক পরিচয় দেওয়া মো. বাবুল হোসেন বলেন, ‘আমি রেলওয়ের সাথে সম্পৃক্ত নই এবং আমি কখনো বাংলাদেশ রেলওয়েতে চাকরি করিনি। তবে আমি কল্যাণ ট্রাস্টের মনোনীত প্রতিনিধি হিসেবে মার্কেট নির্মাণ কাজের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে আছি। আমি একজন ব্যবসায়ী।’
অন্যদিকে অবস্থানগত কারণে রেলওয়ে কল্যাণ ট্রাস্টের মার্কেট নির্মিত হলে নারায়ণগঞ্জবাসীর স্বপ্নের কদমরাসুল সেতু ও রাজউকের ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) প্রকল্প বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হবে।
তথ্যমতে, দেশের ২১টি জেলায় রাউজক কর্তৃক ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) প্রকল্পের একটি নারায়ণগঞ্জের কেন্দ্রীয় রেলস্টেশনে এলাকায় হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্প অনুযায়ী, নদী বন্দর, বাস টার্মিনাল ও রেলওয়ে স্টেশন পাশপাশি অবস্থিত এবং এর এ প্রকল্পের আওতায় এ তিন গণপরিবহন ব্যবস্থান আধুনিকায়ন করা হবে। রাউজকের এ প্রকল্প বাস্তবায়নে লক্ষ্যে তিন প্রতিষ্ঠানের জমির প্রয়োজন হবে।
অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ শহরকে বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করতে ৫নং নৌঘাটে শীতলক্ষ্যা নদীর উপর ৭০০কোটি টাকা ব্যয়ে কদমরাসুল ব্রিজ নির্মাণের কাজ চলছে। ইতিমেধ্য এ প্রকল্পের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ ও টেন্ডার ডাকা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) এই প্রকল্প অনুযায়ী, ব্রীজটির জিরো পয়েন্ট ধরা হয়েছে ১নং রেলগেট সংলগ্ন নারায়ণগঞ্জ কলেজের সামনের স্থানটিকে। স্বাভাবিকভাবে ব্রিজ নির্মাণের পর ওই স্থানটিতে যানবাহনের সঙ্গে বাড়বে যানজট।
এ বিষয়ে নাসিকের ১৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর অসিত বরণ বিশ্বাস বলেন, শহরের ১ নম্বর রেলগেট এলাকাটিতে সারাদিনই যানজট লেগে থাকে। সেখানে সরকারি দুটি বড় প্রকল্প বাস্তাবায়নের কথা রয়েছে। যার জন্য জমিটি অতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে শীতলক্ষ্যা ব্রিজের জিরো পয়েন্ট নির্ধারণ করা হয়েছে নারায়ণগঞ্জ কলেজের সামনে। ব্রিজের জন্য বিআইডাব্লিউটিএ এবং রেলওয়ের কিছু স্থাপনা ভাঙ্গতে হবে। শীতলক্ষ্যা ব্রিজ নির্মাণের পর ওই স্থানের ট্রাফিকের সংখ্যা আরও বাড়বে। এমন অবস্থায় সেখানে আরেকটি মার্কেট তৈরি করা হলে ওই এলাকাটি আরও সংকুচিত হবে এবং অন্যদিকে মানুষের আনাগোনা ও ট্রাফিক বাড়বে। যা অবস্থার অবনতি ঘটাবে।
নারায়ণগঞ্জ ভূমি রক্ষায় সম্মিলিত নাগরিক পরিষদের সভাপতি রফিউর রাব্বি বলেন, রেলওয়ের কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের নামে এখানে রেলের জমি আত্মসাত এবং বিক্রির পায়তারা হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জের কিছু ভূমিদস্যু রেলওয়ের কিছু দুর্নীতিবাজ রেলওয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিলে নিজেদের পকেট ভারী করতে চাচ্ছে। এরা সরকারি জমি দেখলে মনে করে এটা তাদের বাপ-দাদার জমি।
তিনি আরও বলেন, এক নম্বর রেলগেট খুবই জনবহুল একটি এলাকা। তাই এ এলাকায় কিছু খোলা জায়গা থাকা প্রয়োজন। এ জমিতে মার্কেট হলে তা সাধারণ মানুষের, নারায়ণগঞ্জবাসীর কোনো উপকার হবে না। তাই আমরামনে করি এখানে মার্কেটের পরিবর্তে নগরবাসীর মানসিক সু-স্বাস্থ্যের জন্য বসার স্থান বা পার্ক করা হোক।

স্পন্সরেড আর্টিকেলঃ