আজ মঙ্গলবার, ১১ই আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ২৫শে জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

না.গঞ্জে তীব্র হচ্ছে গ্যাস ও পানি সঙ্কট

স্টাফ রিপোর্টার: নারায়ণগঞ্জে দীর্ঘদিন যাবৎ জ¦ালানি গ্যাস ও পানির তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত অতি প্রয়োজনীয় গ্যাস ও পানি না পেয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে নগরবাসী। সঙ্কটগুলো যত স্থায়ী হচ্ছে, মানুষের মধ্যে ততো ক্ষোভ বাড়ছে। এই ক্ষোভ সহসা প্রশমিত করা না গেলে দ্বাদশ নির্বাচনের ভোটে প্রভাব পড়তে পারে বলে মন্তব্য করেছেন অনেকে।
জানা যায়, গত একমাস যাবৎ নারায়ণগঞ্জে দিনের অধিকাংশ সময় থাকছে না জ্বালানি গ্যাস। কিছু কিছু এলাকায় মোমশিখার মত আগুন জ্বললেও অধিকাংশ এলাকায় একদমই চুলা জ্বলছে না। গত ১৫ দিন যাবৎ এ সঙ্কট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। ফলে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত টাকা ব্যয়ে শরণাপন্ন হতে হচ্ছে বিকল্প পন্থা মাটির চুলা বা এলপিজি গ্যাসের ওপর। ফলে মাসে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ করতে হচ্ছে নগরবাসীদের।
অন্যদিকে সিদ্ধিরগঞ্জ, ফতুল্লা ও শহরের বিভিন্ন এলাকায় পানি সঙ্কট বহু দিনের। দিনের পর দিন পর্যাপ্ত ব্যবহার্য পানি পাচ্ছে না স্থানীয়রা। বিকল্প পন্থা হিসেবে, পাশর্^বর্তী ডিপ থেকে সীমিত পরিমাণে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে তাদের। সঙ্কট দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় বিকল্প পন্থায় পানি সংগ্রহও ব্যহত হচ্ছে। ফলে বিপর্যস্থ হচ্ছে জনজীবন।
শহরের দেওভোগ আখড়া এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা আফসানা মাহমুদ বলেন, কিভাবে আমাদের দিন কাটছে সেটা বলে বুঝানো যাবে না। গত ৭দিন যাবৎ আমরা একদমই পানি পাচ্ছি না। প্রতিদিন রাত জেগে পানির জন্য অপেক্ষা করি কিন্তু পানি আসে না। সকালে পাশ^বর্তী ডিপ নলকূপ দীর্ঘ লাইন অতিক্রম করে পানি সংগ্রহ করি। এরপর নাস্তা বানাতে গেলে দেখি গ্যাস নেই। বিকল্প হিসেবে বাড়ির আঙ্গিনায় মাটির চুলায় কোনো রকম রান্না করি। এরপর আবার ছুটতে হয় পানি সংগ্রহের জন্য। গতকাল দুপুরে পানি আনতে গেলে যার ডিপ তিনি জানান, এখন আর পানি দিবেন না, বিকেলে আসতে। কিন্তু বিকেল পর্যন্ত কাজের জন্য পানি কোথাই পাই?
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, গত ১৫-২০দিন যাবৎ হাত মুখ ধোয়ার পানি নেই। ময়লা, দুর্গন্ধ পানি আসলেও কোনো না কোনো কাজে ব্যবহার করা যেত। পাঁচদিন পর গতকাল এক আত্মীয়র বাসায় গিয়ে গোসল ও জামা-কাপড় ধুয়ে এসেছি। গ্যাস নেই কিন্তু বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহার করে কাজ করা যাচ্ছে। পানি সঙ্কটে কোনো বিকল্প আমরা পাচ্ছি না। পাশ^বর্তী ডিপ থেকেও এখন পানি দিতে অসম্মতি জানাচ্ছে। তারাও পানি দিতে দিতে ক্লান্ত। পানি ও গ্যাস সঙ্কটে আমাদের জীবন নড়ক হয়ে যাচ্ছে।
জানা যায়, গত ১৫দিন যাবৎ নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) ১৪ ও ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের পাম্প বিকল হয়ে তীব্র পানির সংকট দেখা দিয়েছে। গতমাসে ৬ দিন সাপ্লাই পানি বন্ধ থাকার পর ৭ দিন যাবৎ পুনরায় পানি সাপ্লাই সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। ফলে মানুষের মধ্যে পানির জন্য হাহাকার সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে দীর্ঘদিন যাবৎ সিটির সিদ্ধিরগঞ্জ অঞ্চলে পানির সঙ্কট চলছে। তিন মাস যাবৎ এ সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করছে। ফলে এ অঞ্চলের আওতাধীন নাসিক ১ থেকে ৯ নম্বর ওয়ার্ড ও ফতুল্লা ইউনিয়নের তল্লা ও আশেপাশের এলাকার মানুষ পর্যাপ্ত পানি পাচ্ছে না। প্রতিদিন ভোর বেলা একবার ঘণ্টা দু-এক পানি আসেলেও এরপর আর পাওয়া যায় না। প্রায় সময় দুর্গন্ধযুক্ত পানি আসে, আবার অনেক এলাকায় পানি পাওয়া যায় না। ফলে দৈনন্দিন কাজের জন্য ব্যবহার্য পর্যাপ্ত পানি পাচ্ছে না তারা। এতে করে নিত্য ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে তাদের।
নাসিক ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পাঠানটুলি এলাকার বাসিন্দা আরিফা আক্তার বলেন, দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে ঠিক মত পানি পাচ্ছি না। প্রতিদিনি ভোর ৪ টার সময় এক থেকে দেড় ঘন্টার জন্য পানি আসে। ঘুর নষ্ট করে সে সময় কষ্ট করে পানি রিজার্ভ ট্যাঙ্কে সংগ্রহ করতে হয়। এরপর সারাদিন পানি থাকে না। কোনোদিন যদি পানি সংগ্রহ করতে না পারি সেদিন খুব কষ্টে করে চলতে হয়।
শহরের মাসদাইর এলাকার বাসিন্দা নাজমা বেগম বলেন, মাসে মাসে গ্যাসের বিল দেই কিন্তু গ্যাস পাই না। প্রতিদিন হোটেল থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে, মাটির চুলা ব্যবহার করতে হচ্ছে। এসবের জন্য গুণতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধোমুখীর এই সময়ে জ্বালানির জন্য এই বাড়তি খরচ বহন করা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না।
সামাজিক সংগঠন আমরা নারায়ণগঞ্জবাসীর সভাপতি নূর উদ্দিন বলেন, আমরা দীর্ঘদিন নারায়ণগঞ্জবাসীর হয়ে এসব বিষয়ে সোচ্চার। এ বিষয়ে আমরা তিতাসের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে এমডির সাথে দেখা করেছি। নারায়ণঞ্জ জেলা কার্যালয় ও জেলা প্রশাসনে একাধিকবার স্মারকলিপি দিয়েছি। যাতে তারা বিষয়টি দেখেন কিন্তু দৃশ্যমান কোনো ফলাফল পাচ্ছি না।
তিনি আরও বলেন, কর্তব্যরত কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনায় আমরা জানতে পেরেছি, সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে গ্যাস সরবরাহ ও ডলার সঙ্কটের কারণে এই সঙ্কট তৈরি হয়েছে। আর বর্তমানে দেশের রিজার্ভ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করার পর আমাদের উপলব্ধি হয়েছে, এই নির্বাচনের আগে এসব সঙ্কট কোনোভাবেই দূর হবে না। কিন্তু মানুষ এত এত সমস্যার মধ্য দিয়ে কতদিন বাঁচতে পারবে সেটা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) জেলা সভাপতি ধীমান সাহা জুয়েল বলেন, পানি ও গ্যাসের সঙ্কট দীর্ঘদিনের। বারবার আন্দোলন, সংগ্রাম করেও আমরা এর কোনো সমাধান পাইনি। এর মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়, সরকারি অধিদপ্তরগুলো কতোটা বিশৃঙ্খল অবস্থায় আছে। পর্যাপ্ত পানি ও গ্যাস না পাওয়ায় নারায়ণগঞ্জের জনজীবন বিপর্যস্থ এবং এর জন্য মানুষ ক্ষুব্ধ। এসবের কারণে জনগণের এই সরকারের প্রতি অনাস্থা তৈরি হয়েছে। যা ভোটে অবশ্যই প্রভাব ফেলবে। যদি ভোট হয় এবং তা সুষ্ঠু প্রক্রিয়ায় হয়।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন বা ভোটের মাঠে তিনিই জয়ী হবেন যার সাথে জনগণ থাকবে। সাধারণ মানুষ তাদের সাথে কখনো থাকবে না যাদের জন্য জনজীবন বাধাগ্রস্থ ও বিপর্যস্থ হচ্ছে।
আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় জাতীয় কমিটির সদস্য ও জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এড. আনিসুর রহমান দিপু বলেন, এগুলো স্বাময়িক অসুবিধা। যা খুব দ্রুতই সমাধান হয়ে যাবে।

স্পন্সরেড আর্টিকেলঃ