আজ মঙ্গলবার, ১০ই বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ২৩শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

দিনেও অবাধে চলছে ট্রাক

স্টাফ রিপোর্টার :
হাই কোর্টের নির্দেশনা কিংবা ঐতিহাসিক গোল টেবিল বৈঠকের সিদ্ধান্ত; কোনো কিছুরই যেন তোয়াক্কা করছেন না নিতাইগঞ্জের অবৈধ স্ট্যান্ডের নেপথ্যের মোড়লরা। স্ট্যান্ড যেমন বহাল তবিয়তে রয়েছে, তেমনই দিনেও ট্রাকের অবাধ চলাচল দেখা যাচ্ছে প্রতিনিয়তই। ফলে জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সিদ্ধান্ত এখন প্রশ্নবিদ্ধ হতে শুরু করেছে।
জানা গেছে, গত ৩ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত গোল টেবিল বৈঠকে নিতাইগঞ্জের অবৈধ ট্রাক স্ট্যান্ড এবং দিনের বেলায় ট্রাকের চলাচল নিয়ে ঘোর আপত্তি জানিয়ে বক্তব্য রেখেছিলেন সিটি মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভী, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান এবং নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। নগরীতে যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে ট্রাকের অবৈধ স্ট্যান্ড এবং অবাধ চলাচলের বিষয়টি উত্থাপন করেন তারা।
এর মধ্যে এমপি শামীম ওসমান বলেছিলেন, ‘ঢাকা শহরে রাত ১০টার আগে ট্রাক ঢুকতে পারে না। তাহলে নারায়ণগঞ্জ শহরে ১০টার আগে ট্রাক চলবে কেন। মেয়রকে অনুরোধ করে বলবো যে, শুধু মাত্র চাষাড়া সোনালী ব্যাংকের সামনেই না, আপনার সিটি করপোরেশন তো সিদ্ধিরগঞ্জের পুল পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে। সেখানে যদি নাও যেতে পারেন, আপনি হাজীগঞ্জ মোড়ে ব্যারিয়ার দেন। ওইটা রাত ১০টার পরে যেন সরিয়ে দেয় এবং ট্রাক যেন রাত ১০টার পরেই শহরে ঢুকে। এটা ৪-৫ জায়গায় বসালেই হয়। অথবা পুলিশ যদি এনশিউর করে যে, রাত ১০টার আগে কোনো ট্রাক ঢুকবে না এবং সকাল ৬টার মধ্যে সকল ট্রাক শহর থেকে বেড়িয়ে যাবে। এটাও একটা সমাধান।’
সিটি মেয়র আইভী বলেছিলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন ট্রাক দিয়ে বন্দী। ট্রাক স্ট্যান্ড নিয়ে মামলা করা হয়েছে হাইকোর্টে। মামলাতে স্পষ্ট রায় দেওয়া হয়েছে, ডিসি সাহেব ও এসপি সাহেবকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, উচ্ছেদ করে ওই জায়গাকে মুক্ত করে তা হাইকোর্টকে জানাতে হবে। আগের যিনি ডিসি সাহেব ও এসপি সাহেব ছিলেন, তাদের সাথে মিটিং হয়েছে। আমরা একটা করে লাইন দিয়েছি। এখন একটা লাইন তো দূরের কথা ৩টা ৪টা করে লাইন করে। মাঝে মাঝে আমি ফোন দেই যে, ভাই আমি তো বন্ধী হয়ে আছি। পুরো শহরটাই যেন বাস আর ট্রাকের নগরীতে পরিণত হয়েছে।’
মেয়র এবং এমপির এমন বক্তব্যের পর জেলা প্রশাসক মাহমুদুল হক, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আমীর খসরু এবং জেলা ট্রাফিক পুলিশের এএসপি রুহুল আমিন সাগর গোল টেবিল বৈঠকে বলেছিলেন, নিতাইগঞ্জের অবৈধ ট্রাক স্ট্যান্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবেন তারা। এছাড়াও দিনের বেলায় নগরীতে কোনো ট্রাক চলাচল করতে দেয়া হবে না বলেও সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন তারা।
তবে, বৈঠকের পরদিনও নিতাইগঞ্জের অবৈধ ট্রাক স্ট্যান্ড বহাল তবিয়তে দেখা গেছে। এমনকি যথারীতি দিনের আলোতে শহুরে সড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ট্রাকগুলো।
এর আগে ২০১৬ সালের ২৭ নভেম্বর হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের সমন্বয়ে গঠিত একটি বেঞ্চ অবৈধ ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদের আদেশ দেন। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এলাকা থেকে সব ধরনের অবৈধ স্ট্যান্ড অপসারণে হাইকোর্টের নির্দেশনা চেয়ে একই বছর ওই রিট পিটিশনটি করেছিলেন মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী। এরপরও উচ্ছেদ হয়নি অবৈধ ওই ট্রাক স্ট্যান্ড।
সরেজমিনে দেখা যায়, নগরীর বঙ্গবন্ধু সড়কের নিতাইগঞ্জ অংশে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতাল, নগর ভবন, মণ্ডলপাড়া ফায়ার স্টেশনসহ বেশ কয়েকটি জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সামনের রাস্তায় অবৈধ ট্রাকস্ট্যান্ড গড়ে তোলা হয়েছে। ট্রাকস্ট্যান্ডের কারণে নগরের পথচারী, এলাকাবাসী এবং যাত্রীদের প্রতিনিয়ত যানজটে পড়তে হচ্ছে।
এদিকে মণ্ডলপাড়া ফায়ার স্টেশনের ফটকের সামনে ট্রাক থামিয়ে পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজ করা হয়। এ কারণে অগ্নিনির্বাপণকাজে গাড়ি ঘটনাস্থলে সময়মতো পৌঁছাতে না পারার ঘটনা প্রায়ই ঘটছে বলে অভিযোগ করেছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।
নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জে ভোগ্যপণ্য ব্যবসায়ীদের মালামাল দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবহন করার কাজ করে এই অবৈধ স্ট্যান্ডের ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানগুলো। এ ছাড়া টানবাজারের ব্যবসায়ীদের সুতা, রং ও কেমিক্যালও এখান থেকে পরিবহন করা হয়। এখানে প্রতিদিন মোটা অঙ্কের চাঁদা লেনদেন হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে, জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের এএসপি (ট্রাফিক) রুহুল আমিন সাগর দৈনিক সংবাদচর্চাকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের মেয়র বলেছিলেন যে, নিতাইগঞ্জের ওই স্ট্যান্ডে ট্রাকগুলো সিঙ্গেল লাইন করে থাকলে তেমন সমস্যা নেই। আমার জানা মতে, বর্তমানে এক লাইনেই আছে। আর ট্রাক চলাচলের ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন থেকে যদি আমাদের একটা সময় সীমা নির্ধারণ করে জানিয়ে দেয়া হয় যে, দিনের কোন সময়টায় শহরে ট্রাক কিংবা অন্যান্য ভারি যানবাহন ঢুকতে পারবে না, এমন নির্দেশনা পেলে আমাদের জন্য ভালো হয়। আমরা সেই নির্দেশনা মোতাবেক কাজ করতে পারবো। তাছাড়া আমাদের পুলিশ সদস্যরা মাঠেই কাজ করছে। তবে ম্যাজিস্ট্রেটি সহায়তা পেলে আমাদের অভিযানে আরও সুবিধা হতো। পর্যায়ক্রমে সকল সমস্যাই দূর হবে।’
এদিকে, গোল টেবিল বৈঠকের পরদিনই অভিযান চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করা নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক দৈনিক সংবাদচর্চাকে বলেন, ‘অবৈধ স্ট্যান্ডগুলো একদিনের না। এগুলো দীর্ঘ দিনের। এগুলো সরাতে কিছুটা সময় লাগবে। আমরা চেষ্টা করছি।’

স্পন্সরেড আর্টিকেলঃ