১৩ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, সোমবার, রাত ১:০৩

জিসার ঘটনায় হাইকোর্টে মামলা

সংবাদচর্চা রিপোর্টঃ

নারায়ণগঞ্জে গণধর্ষণ ও হত্যার শিকার স্কুলছাত্রীর লাশ নদীতে ফেলে দেয়ার দেড় মাস পর জীবিত ফেরত আসার ঘটনায় হাইকোর্টে রিভিশন মামলা দায়ের করেছেন পাঁচ আইনজীবী। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় পাঁচজন আইনজীবীর পক্ষে অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির রিভিশনটি দায়ের করেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে এই ঘটনা প্রকাশিত হলে সে সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনও সংযুক্ত করা হয়েছে আবেদনের সাথে।

আবেদনে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় করা মামলা এবং মামলা পরবর্তী প্রক্রিয়ার শুদ্ধতা, বৈধতা এবং যৌক্তিকতা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এছাড়া ওই মামলার নথি তলবেরও আবেদন করা হয়েছে। আবেদনে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ সুপার, সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, বাদী এবং আসামিদের বিবাদী করা হয়েছে।

আইনজীবী শিশির মনির জানান, রিভিশনে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় দায়েরকৃত মামলা এবং মামলা পরবর্তী প্রক্রিয়ার শুদ্ধতা, বৈধতা এবং যৌক্তিকতা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ওই আবেদনে আদালতে উক্ত মামলার নথি তলব করে পরীক্ষাপূর্বক উপযুক্ত আদেশ দেওয়ার জন্য প্রার্থনা করা হয়েছে। তখন আদালত আইনজীবী শিশির মনিরকে এ বিষয়ে লিখিত আবেদন করতে বলেন। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ২৫ আগস্ট হাইকোর্টে একটি রিভিশন মামলা দায়ের করা হয়েছে।

গত ৪ জুলাই নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ এল এন রোড এলাকার স্কুলছাত্রী জিসা মনি (১৫) নিখোঁজ হয়। বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজির পর ১৭ জুলাই সদর মডেল থানায় একটি জিডি করেন স্কুলছাত্রীর বাবা জাহাঙ্গীর হোসেন। এক মাস পর ৬ আগস্ট একই থানায় স্কুলছাত্রীর বাবা অপহরণ মামলা করেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয় বন্দর উপজেলার বুরুন্ডি খলিলনগর এলাকার আমজাদ হোসেনের ছেলে আব্দুল্লাহ (২২) ও তার বন্ধু বুরুন্ডি পশ্চিমপাড়া এলাকার সামসুদ্দিনের ছেলে রকিবকে (১৯)। ওই দিনই তাদের গ্রেফতার করা হয়। একই ঘটনায় দুইদিন পর গ্রেফতার করা হয় বন্দরের একরামপুর ইস্পাহানি এলাকার বাসিন্দা নৌকার মাঝি খলিলকে (৩৬)।

গত ৯ আগস্ট পুলিশ জানায়, স্কুলছাত্রীকে গণধর্ষণের পর হত্যা করে মরদেহ নদীতে ভাসিয়ে দেয় আসামিরা। তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় এ ঘটনা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে। অথচ ২৩ আগস্ট দুপুরে বন্দরের নবীগঞ্জ রেললাইন এলাকায় সুস্থ অবস্থায় পাওয়া যায় নিখোঁজ স্কুলছাত্রীকে। এ ঘটনায় চারদিকে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। পুলিশের তদন্ত ও আদালতে দেওয়া জবানবন্দি প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এদিকে গ্রেফতার আসামিদের স্বজনরা বলছেন, পুলিশি হেফাজতে অমানুষিক নির্যাতনের মুখে তারা ধর্ষণ ও হত্যার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। পুলিশ এই ঘটনা সাজিয়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সদর থানা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) শামীম আল মামুন আসামির স্বজনদের কাছ থেকে অবৈধ উপায়ে কয়েক হাজার টাকা নিয়েছেন বলেও রয়েছে অভিযোগ।

জীবিত ব্যক্তিকে ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ ভাসিয়ে দেওয়ার জবানবন্দি কেন দিলো আসামিরা এর কোন সদুত্তর নেই পুলিশের কাছে। এই ঘটনার তদন্তের স্বার্থে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি) জাহেদ পারভেজ চৌধুরীকে প্রধান করে সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার ও জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার কর্মকর্তা পরিদর্শক ইকবাল হোসেনকে সদস্য করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সদর মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শামীম আল মামুনকে পরিবর্তন করে পরিদর্শক আব্দুল হাইকে দেওয়া হয়েছে।

তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহেদ পারভেজ চৌধুরী বলেন, ‘পুলিশ সুপারের নির্দেশে এই কমিটি তদন্তে সহযোগিতা করছে। পুরো বিষয়টি এখনও বুঝে উঠিনি আমরা। আজকে কাজ শুরু করেছি। তিনজনের জবানবন্দি পড়ে দেখেছি। আসলে কী হয়েছে এবং কেন তারা এমন স্বীকারোক্তি দিলো পুরো বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে।’

এদিকে পূর্বের তদন্ত কর্মকর্তা এসআই শামীম আল মামুনের বিরুদ্ধে আসামিদের নির্যাতনের মুখে ‘মিথ্যা জবানবন্দি’ ও আসামির স্বজনদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগের তদন্তে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মোস্তাফিজুর রহমানকে প্রধান করে আরও একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জায়েদুল আলম জানান, যে তিন আসামি আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে আছে তারা যাতে ন্যায় বিচার পায় সে বিষয়ে নজর রেখে কাজ করছি। তদন্তে পুলিশের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে দেওভোগের এলএন রোড এলাকায় নিজ বাসাতে কথা হয় স্কুল ছাত্রী জিসা মনির সাথে। জিসা প্রেস নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘সেদিন আব্দুল্লার আমাকে বাস স্ট্যান্ডে দেখা করতে বলেছিল। কথা মতো আমি বাস স্ট্যান্ড যাই। কিছুক্ষন আমাদের কথা হয়। কথার এক পর্যায়ে আব্দুল্লাহ আমাকে বলে, আমি কিছু খাবার কিনে নিয়ে আসছি। ১০ মিনিট পার হয়ে যাওয়ার পরও সে আসছিল না। সেদিন আব্দুল্লার কাছে কোনো ফোনও ছিল না তাই তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলাম না। তখন আমি ইকবালকে ফোন করি এবং আমাকে নিয়ে যেতে বলি। ইকবাল আমাকে নিতে আসে।

সে সময় আমরা সিদ্ধান্ত নেই আমরা বিয়ে করবো। ইকবাল আমাকে নিয়ে প্রথমে ঢাকা শনির আখড়া এলাকায় নিয়ে যায়। সেদিনই আবার আমরা ঢাকা থেকে বন্দর চলে আসি। বন্দরে একটি বাসা ভাড়া নেই এবং বিয়ে করি। বিয়ের পর ভয়ে পরিবারের সঙ্গে কোনো রকম যোগাযোগ করিনি। এর এক মাস পর ২৩ আগস্ট আমার স্বামী ইকবাল আমার মাকে ফোন দেয় এবং নিজেকে আমার স্বামী পরিচয় দেয়। এ সময় আমি আমার মায়ের সঙ্গে কথা বলি এবং বাড়ি ফেরার জন্য ৪ হাজার চাই। পরে সেদিনই পুলিশ এবং আমার মা গিয়ে আমাকে নিয়ে আসে। এর মধ্যে এখানে কি হচ্ছিল আমি কিছুই জানি না।’

জিসা মনি ফিরে আসার পর তাকে অপহরনের মামলায় স্বামী ইকবাল পন্ডিতকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ইকবাল পন্ডিত যাত্রাবাড়ির মাতুয়াইলের মৃত সোহরাব পন্ডিতের ছেলে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। আগামীকাল (২৭ আগস্ট) রিমান্ড শুনানি হবে।

কথা হয় জিসা মনির বাবা জাহাঙ্গীর হোসেনের সাথে। মেয়েকে ফিরে পেলেও মেয়ের জামাই এখন তাকে অপহরনের দায়ে হাজতে। তাকে জামিনে ছাড়িয়ে আনার চেষ্টা করছেন বলে জানালেন জাহাঙ্গীর। তিনি বলেন, মেয়ে তো পাইছি। আসামিদের বিরুদ্ধে এখন আর কোন অভিযোগ আমার নাই। কিন্তু এখন পড়ছি নতুন ঝামেলায়। মেয়ের জামাই তো হাজতে। তারে ছাড়ানোর ব্যবস্থা করতাছি। কী করমু বুঝতাছি না। পুলিশ-প্রশাসন যেভাবে বলতেছে সেভাবেই কাজ করতেছি।

স্পন্সরেড আর্টিকেলঃ