Home / সাহিত্য ও সভ্যতা / গ্রন্থ সমালোচনা ১: অসমাপ্ত আত্মজীবনী- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

গ্রন্থ সমালোচনা ১: অসমাপ্ত আত্মজীবনী- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

তিনি রাজনীতির মানুষ, লেখক নন। শব্দ আর বাক্যের ব্যবহারে, ভাষা আর অলংকারে, উপমা আর রূপকের কারুকার্যে মন ভোলানো লেখনি তাঁর ছিল না। কিন্তু তারপরেও মন্ত্রমুগ্ধের মতো পড়তে হয়। সহজ মানুষের সহজ বাক্য, সহজ শব্দ, সহজ ভাষা, হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা, ঠিক তাঁর ভাষণগুলোর মতোই। বন্ধুবান্ধব আর স্ত্রীর অনুরোধে জেলখানার বসে তিনি লিখতে শুরু করেছিলেন তাঁর অসমাপ্ত জীবনের অসমাপ্ত গল্প। বইয়ের একেবারে শুরুতেই সরল স্বীকারোক্তি, “লিখতে যে পারি না; আর এমন কী করেছি যা লেখা যায়! আমার জীবনের ঘটনাগুলি জেনে জনসাধারণের কি কোনো কাজে লাগবে? কিছুই তো করতে পারলাম না। শুধু এটুকু বলতে পারি, নীতি ও আদর্শের জন্য সামান্য একটু ত্যাগ স্বীকার করতে চেষ্টা করেছি।”
‘শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা চারটি খাতা ২০০৪ সালে আকস্মিকভাবে তাঁর কন্যা শেখ হাসিনার হস্তগত হয়। খাতাগুলি অতি পুরানো, পাতাগুলি জীর্ণপ্রায় এবং লেখা প্রায়শ অস্পষ্ট। মূল্যবান খাতাগুলি পাঠ করে জানা গেল এটি বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী, যা তিনি ১৯৬৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে অন্তরীণ অবস্থায় লেখা শুরু করেছিলেন, কিন্তু শেষ করতে পারেননি।’ বইটিকে ফ্ল্যাপে এভাবেই পরিচিত করে দেয়া হয়েছে। লেখক যখন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তখন এর চেয়ে অধিক ভূমিকার আর কী প্রয়োজন থাকতে পারে!
বইটা শেষ করতে হলো বেশ ভালো রকমের অতৃপ্তি নিয়ে। অতৃপ্তির কারণ আসলে নামেই বোঝা যায় – অসমাপ্ত আত্মজীবনী। কোনো পরিকল্পনা ছাড়া, কোনো উপসংহার ছাড়া, লেখকের অসমাপ্ত জীবনের মতোই একেবারেই হুট করে শেষ হয়ে গেল বইটা। এই অঞ্চলের রাজনীতি যখন ধীরে ধীরে নানা কুশীলবের অংশগ্রহণে জটিল হয়ে উঠছে, পশ্চিম পাকিস্তানি আর তার ধামাধরা স্বার্থান্বেষী বাঙ্গালিরা যখন সদ্য স্বাধীন দেশে ইংরেজ আমলের ঔপনিবেশিক পন্থা টিকিয়ে রেখে নতুন ভাবে শোষণের জাল বিস্তার করছে, গোপালগঞ্জের কিশোর শেখ মুজিব যখন একটু একটু করে গোটা বাংলাদেশের শেখ মুজিব হয়ে উঠছেন ঠিক তখনই শেষ হয়ে গেল বইটা।
বইটির রচনাকাল ১৯৬৭ সাল হলেও এই বইয়ে মূলত উঠে আসার সুযোগ পেয়েছে লেখকের রাজনৈতিক জীবনের শৈশব থেকে রাজনৈতিক যৌবনের শুরুর দিককার অংশ। পাকিস্তানের আন্দোলনের সময়কার রাজনীতি সচেতন এক কিশোর মুজিব থেকে ১৯৫৪ এর যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের কড়চা পর্যন্ত মূলত এই বইয়ের কলেবর। বঙ্গবন্ধুর ঘটনাবহুল জীবনের খুব সামান্য অংশের সাথেই, আরও সঠিকভাবে বলতে গেলে একেবারে শুরু দিকের অংশের সাথেই কেবল পরিচিত করায় এই বইটি। এখানে গোপালগঞ্জের ডানপিটে সাহসী সমাজ সচেতন কিশোর শেখ মুজিবের পরিণত বলিষ্ঠ নেতা হয়ে ওঠার কিছুটা আভাস পাই। কিন্তু সেখান থেকে বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠার গল্পের প্রায় কিছুই আমরা পাই না। কিন্তু এই হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটার সাথে, তাঁর রাজনৈতিক দর্শন আর উপলব্ধির সাথে, তাঁর চেতনা আর স্বপ্নের সাথে, তাঁর বোধ আর বোধের বিবর্তনরেখার সাথে পরিচিত হয়ে উঠি। কোনো রাজনৈতিক আশীর্বাদপুষ্ট বা বিশাল প্রভাবশালি ধনাঢ্য কোনো পরিবারে জন্ম নেন নি তিনি। গ্রামের এক সাধারণ মধ্যবিত্ত গৃহস্থ পরিবারে জন্ম নেয়া একজন কীভাবে হয়ে উঠলেন বাংলার মানুষের আশা আকাঙ্খার প্রতীক? যেসব নেতাদের কাছে রাজনীতির পাঠ নিয়ে কিশোর মুজিব উঠে এসেছেন ধীরে ধীরে, মঞ্চের সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে কীভাবে তিনি তাঁদের ছাপিয়ে আরও অনেক উপরে উঠে গেলেন? কীভাবে হয়ে উঠলেন নেতাদের নেতা? সাম্প্রদায়িকতাকে উপজীব্য করে শুরু হয়েছিল যে আন্দোলন, সেই পাকিস্তান আন্দোলনের একজন কর্মী হিসেবে যাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা তিনি কীভাবে আর কেন হয়ে উঠলেন অসাম্প্রদায়িক বাংলার গণমানুষের নেতা?
শেখ মুজিব রাজনীতি করেছেন মূলত মানুষের জন্য, আর কিছু না বোঝা গেলেও এইটুকু অন্তত বুঝতে পারা যায় এই তিনশ পৃষ্ঠার এই ছোট্ট বই থেকে। আর এই জন্যই তাঁর কোনো পিছুটান ছিল না, স্বার্থের জন্য আপোষের মনোভাব ছিল না, পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার দায় ছিল না। যা করেছেন নিজে বিশ্বাস করে করেছেন। এজন্যে বারবার তিনি উল্লেখ করেছেন তিনি গোপন রাজনীতি বা পালিয়ে থেকে বিবৃতি দেয়ার রাজনীতি পছন্দ করতেন না। বারবার গ্রেফতার হয়েছেন তিনি শোষক শ্রেণির দ্বারা। পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন কিন্তু সেই আন্দোলনের ফসল পাকিস্তানে একেবারে শুরু থেকেই তিনি জেলের ভেতর কাটিয়েছেন অধিকাংশ সময়। ধীরে ধীরে তিনি বুঝতে পেরেছেন যে জন্য সংগ্রাম করেছিলেন তা তিনি পাননি, বরং সাদা চামড়ার বদলে কালো চামড়ার শোষণ পেয়েছে জনগণ। দেখলেন, শাসকের নাম বদলেছে রঙ বদলেছে, কিন্তু চরিত্র বদলায় নি। যাদের সাথে নিয়ে পাকিস্তান আন্দোলন করেছেন, তাদের অনেকের বিপক্ষেই তাই তাঁর আর তাঁর সমমনাদের নতুন সংগ্রাম শুরু হলো।
দুইশ বছরের বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসন এই অঞ্চলের মুসলমান আর হিন্দুর মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরাজমান যে অসন্তোষ তা কেবল বৃদ্ধিই করেছিল। তার চূড়ান্ত রূপ পায় সম্ভবত যখন ধর্মের নামে দেশভাগের আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়ল ভারতের মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। এই অঞ্চলের মুসলমানদের জন্য উন্নতির আর কোনো বিকল্প পথ খোলা ছিল কিনা, সেই বিতর্ককে এই লেখায় সাবধানে পাশ কাটিয়েই বলা যায়, কোনো সাম্প্রদায়িক আন্দোলন সাধারণত কোনো ভালো ফলাফল বয়ে আনে না। দেশভাগ আর তার আগে পরের সময়ের কথা বার বার উঠে এসেছে। উঠে এসেছে হিন্দু মুসলমান দাঙ্গার কথা, কখনও ঢাকায়, কখনও কোলকাতায়, কখনও এপারে, কখনও ওপারে। কখনও রাজনৈতিক নেতারা হিন্দু-মুসলিম অসন্তোষ উস্কে দিয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সৃষ্টিতে সহায়তা করেছেন, নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে। এখনকার মতোই ইমাম, হুজুর আর পীরসাহেবেরা অংশ নিয়েছেন ধর্মভিত্তিক রাজনীতির অনুঘটক হিসেবে। জনগণকে ধর্মের নামে আলাদা করতে চেয়েছেন বারবার, সাম্প্রদায়িক নেতা আর অনেক ধর্মগুরু। এইসব ঘটনাই সম্ভবত ধীরে ধীরে সাম্প্রদায়িক পাকিস্তান আন্দোলনের একজন নিবেদিত কর্মী শেখ মুজিবকে বুঝতে শিখিয়েছে একটি অসাম্প্রদায়িক দেশ না গড়তে পারলে আসলে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে না।
পাকিস্তান আমল থেকেই শুরু হয় যে কোনো ইস্যুতে ভারত আর ইসলাম ধ্বংসের জুজু দেখানো শুরু হয়। অবাক হয়ে লক্ষ্য করি সেই রাজনীতি করে যাচ্ছে এখনও সেই পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ভূত। ২১ শে ফেব্রুয়ারির আন্দোলনে গুলি চালানোর পরে সরকার থেকে বলা হয়, “হিন্দু ছাত্ররা কলকাতা থেকে এসে পায়জামা পরে আন্দোলন করেছে।” ধীরে ধীরে তিনি উপলব্ধি করেছেন পাকিস্তান আসলে একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে। দুঃখ করেই তিনি লিখেছেন, “দুঃখের বিষয়, পাকিস্তান আন্দোলনের যারা বিরোধিতা করেছিল, এখন পাকিস্তানকে ইসলামিক রাষ্ট্র করার ধুয়া তুলে রাজনীতিকে তারাই বিষাক্ত করে তুলেছে। মুসলিল লীগ নেতারাও কোনো রকম অর্থনৈতিক ও সমাজনৈতিক প্রোগ্রাম না দিয়ে একসঙ্গে যে স্লোগান নিয়ে ব্যস্ত রইল, তা হল ‘ইসলাম’।” অবাক লাগে, ধর্ম বেঁচে যারা মূলত জীবন ধারণ করে, তাদের চারিত্রিক গুণাবলি এত বছর পরেও খুব একটা বদলায় নি। যুক্তফ্রন্টের আর মুসলিম লীগের নির্বাচনের সময় মুজিবের সাথে জনপ্রিয়তায় টেক্কা দিতে না পেরে ঠিক এখনকার মতোই ধর্মের ট্রাম্পকার্ড খেলার চেষ্টা করে মুসলিম লীগ। লেখকের ভাষায়, “… মুসলিম লীগ যখন দেখতে পেলেন তাদের অবস্থা ভালো না, তখন এক দাবার ঘুঁটি চাললেন। অনেক বড় বড় আলেম, পীর ও মাওলানা সাহেবদের হাজির করলেন। … … এক ধর্মসভা ডেকে ফতোয়া দিলেন আমার বিরুদ্ধে যে, ‘আমাকে ভোট দিলে ইসলাম থাকবে না, ধর্ম শেষ হয়ে যাবে’। সাথে শর্ষিনার পীর সাহেব, বরগুনার পির সাহেব … … সবাই আমার বিরুদ্ধে নেমে পড়লেন এবং যত রকম ফতোয়া দেওয়া যায় তাহা দিতে কৃপণতা করলেন না।” কিন্তু বাংলার মানুষের জন্য রাজনীতি করতে করতে তিনি ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন বাঙালিকে এইভাবে ধোকা দেওয়া যাবে না।
আমি বইটি থেকে মূলত সেই সময়ের শেখ মুজিবের রাজনৈতিক দর্শন বুঝতে চেষ্টা করেছি। পাতার পর পাতা থিসিস লিখে আর গবেষণা করে মাঠের রাজনীতিতে যারা কিছুই করতে পারেন নি তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন নি তিনি। তিনি কাজ করতে করতে শিখেছেন, ভুল হলে স্বীকার করেছেন, সংশোধনের চেষ্টা করছেন। বলেছেন এভাবে, “আমার যদি কোনো ভুল হয় বা অন্যায় করে ফেলি, তা স্বীকার করতে আমার কোনোদিন কষ্ট হয় নাই। ভুল হলে সংশোধন করে নেব, ভুল তো মানুষেরই হয়ে থাকে। … … আমি অনেকের মধ্যে দেখেছি, কোনো কাজ করতে গেলে শুধু চিন্তাই করে। চিন্তা করতে করতে সময় পার হয়ে যায়, কাজ আর হয়ে ওঠে না। … … আমি চিন্তা ভাবনা করে যে কাজটা করব ঠিক করি, তা করেই ফেলি। যদি ভুল হয় সংশোধন করে নেই। কারণ যারা কাজ করে তাদেরই ভুল হতে পারে, যারা কাজ করে না তাদের ভুলও হয় না।”
আন্দোলন আর সংগ্রামের ইতিহাসের মধ্যে দিয়ে সেই সময়কার গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব নেতার সাথে বিভিন্ন তাঁর মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে সেইসব নেতাদের কিছু পরিচয় পাওয়া যায়। বইয়ে ঘুরে ফিরে এসেছে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের কথা, যাঁর হাত ধরে তিনি রাজনীতি শিখেছেন। লেখক একেবারে শুরুর দিকেই বলছেন, “ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ছোট্ট কোঠায় বসে জানালা দিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে চেয়ে ভাবছি, সোহরাওয়ার্দী সাহেবের কথা। কেমন করে তাঁর সাথে আমার পরিচয় হল। কেমন করে তাঁর সান্নিধ্য আমি পেয়েছিলাম। কিভাবে তিনি আমাকে কাজ করতে শিখিয়েছিলেন এবং কেমন করে তাঁর স্নেহ আমি পেয়েছিলাম।” বার বার বিভিন্ন জায়গায় তিনি সোহরাওয়ার্দী সাহেবের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন, তাঁর নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন। কিন্ত অবাক লাগে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একেবারে শুরুর দিকে যখন শেখ মুজিব একাবেরাই বিশিষ্ট কেউ হয়ে ওঠেন নি, তখনও তাঁর নিজের মত আর বিশ্বাসের প্রতি ছিল ভয়ঙ্কর আত্মবিশ্বাস। এক সভার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলছেন, “তিনি আনোয়ার সাহেবকে একটা পদ দিতে বললেন। আমি বললাম কখনোই হতে পারে না। সে প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোটারি করেছে, ভালো কর্মীদের জায়গা দেয় না। কোনো হিসাব নিকাশ কোনোদিনও দাখিল করে না। শহীদ সাহেব আমাকে বললের Who are you? You are nobody. আমি বললাম, If I am nobody, then why you have invited me? You have no right to insult me. I will prove that, I am somebody. Thank you, sir. I will never come to you again.” অবাক হয়ে ভাবতে হয়, কতটুকু আত্মবিশ্বাস থাকলে একটা ছোট্ট মহকুমার সামান্য একজন কিশোর রাজনীতিবিদ সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতার সামনে এভাবে নিজের মতামত দিতে পারে!
পশ্চিম পাকিস্তানি তথা অবাঙ্গালি নেতাদের মধ্যে একমাত্র জিন্নাহর প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ছিল বলে মনে হয়েছে। বাকি অধিকাংশ অবাঙ্গালি নেতা মূলত স্বার্থান্বেষী আর ক্ষমতালিপ্সু মনোভাবই ফুটে উঠেছে লেখার বিভিন্ন অংশে। ধীরে ধীরে সম্ভবত তিনি এটাও বুঝতে পেরেছিলেন যারা পশ্চিম পাকিস্তানিদের ধামাধরা, মূলত ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করেন, তাঁরাই রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার করতে পছন্দ করেন। বিশেষ করে চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের সময় নেজামে ইসলামের নেতাদের ক্ষমতালিপ্সু আদর্শহীন মনোভাব তাঁকে পীড়িত করে। কিন্তু এইসব শিক্ষাই তাকে ধীরে ধীরে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির গুরুত্ব আরও ভালোভাবে উপলব্দি করতে উদ্বুদ্ধ করে। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে তিনি মূল্যায়ন করছেন এভাবে, “এই নির্বাচনে একটা জিনিস লক্ষ্য করা গেছে যে, জনগণকে ‘ইসলাম ও মুসলমানের নামে’ স্লোগান দিয়ে ধোঁকা দেওয়া যায় না। ধর্মপ্রাণ বাঙালি মুসলমানরা তাঁদের ধর্মকে ভালোবাসে; কিন্তু ধর্মের নামে ধোঁকা দিয়ে কার্যসিদ্ধি করতে তারা দিবে না এ ধারণা অনেকেরই হয়েছিল।”
সেই সময়ের আরেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা মাওলানা ভাসানী, যাঁকে বইয়ে বিভিন্ন জায়গায় লেখক মূলত মাওলানা সাহেব হিসেবে সম্মোধন করেছেন, তাঁর প্রতি বিভিন্ন জায়গায় ভরসা আর শ্রদ্ধার প্রকাশ থাকলেও তাঁর কিছু কর্মকাণ্ডে লেখকের বিরক্তিও চাপা থাকেনি। ব্যক্তিগতভাবে মুক্তিযুদ্ধের সময় আর তাঁর নিকটবর্তী সময়কাল ছাড়া মাওলানা ভাসানীর ব্যাপারে খুব বেশি জানাশোনা আমার নেই। কিন্ত মুক্তিযুদ্ধের সময় আর তার নিকট অতীতে, গুরুত্বপূর্ণ সময় আর সিদ্ধান্তের সময় উধাও হয়ে যাওয়ার বা দায়িত্ব না নেয়ার কথা পড়েছি। মাওলানা ভাসানীর এই রকম কিছু কর্মকাণ্ডে নিজের বিরক্তি বেশ ভালোভাবেই প্রকাশ করেছেন,”মাওলানা ভাসানীর এই দরকারের সময় আত্মগোপনের মনোভাব কোনোদিন পরিবর্তন হয় নাই। ভবিষ্যত অনেক ঘটনায় তার প্রমাণ হয়েছে।” এখানেই সম্ভবত পার্থক্য গড়ে উঠেছে। একজন যিনি গণমানুষের নেতা হয়েও অনেক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দায়িত্বকে পাশ কাটিয়ে গেছেন, রাজনৈতিক কেবলা বা অন্য কোনো কারণে নিজের হাতে দায়িত্বের কালিমা লাগাতে চান নি, আর অন্যজন সামান্য এক মহকুমার সচেতন কিশোর রাজনীতিবিদ থেকে হাতে কলমে কাজ করে, ভুল করতে করতে হয়ে উঠেছেন গণমানুষের নেতা, বাঙ্গালির আশা আকাঙ্খার প্রতীক।
মূলত সাম্যে বিশ্বাস বিশ্বাস করতেন তিনি, বিশ্বাস করতেন গণমানুষের অধিকারে। সরাসরি সমাজতান্ত্রিক রাজনীতি তিনি করেন নি। বিভিন্ন সময় তাঁর লেখায় মনে হয়েছে তিনি অতি বিপ্লবীদের পছন্দ করতেন না তিনি। কারণ এই অঞ্চলের অতি বিপ্লবীদের অনেকেই ছিল মূলত খাতা কলমের রাজনীতিবিদ আর জনবিচ্ছিন্ন। অন্যদিকে তিনি চেয়েছেন জণগণকে নিয়ে প্রকাশ্য নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করতে। নিজে সরাসরি সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন না করলেও তিনি মূলত সমাজতন্ত্রের মূলনীতি অর্থাৎ সাম্যে বিশ্বাস করতেন। প্রায় একই সময় স্বাধীন হওয়া কম্যুনিস্ট নতুন চীন সফরে গিয়ে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন আর উপলব্ধি করেছেন নেতাদের স্বার্থান্বেষী কার্যকলাপে কীভাবে জণগনের স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটছে। চীন সফরের কথা লিখতে গিয়ে সমাজতন্ত্রের প্রতি তার মনোভাব ব্যক্ত করতে গিয়ে বলছেন, “আমি নিজে কম্যুনিস্ট নই। তবে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বিশ্বাস করি না। এঁকে আমি শোষণের যন্ত্র হিসাবে মনে করি। এই পুঁজিপতি সৃষ্টির অর্থনীতি যতদিন দুনিয়ায় থাকবে ততদিন দুনিয়ায় মানুষের উপর থেকে শোষণ বন্ধ হতে পারে না।” আরও বলছেন এভাবে, “আওয়ামী লীগ ও তার কর্মীরা যে কোনো ধরণের সাম্প্রদায়িকতাকে ঘৃণা করে। আওয়ামী লীগের মধ্যে অনেক নেতা ও কর্মী আছে যারা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করে; এবং তারা জানে সমাজতন্ত্রের পথই একমাত্র জনগণের মুক্তির পথ। ধনতন্ত্রবাদের মাধ্যমে জনগণকে শোষণ করা চলে। যারা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করে, তারা কোনোদিন সাম্প্রদায়িকিতায় বিশ্বাস করতে পারে না। তাদের কাছে মুসলমান, হিন্দু, বাঙালি, অবাঙালি সকলেই সমান।” সমাজতন্ত্রের প্রতি এই দূর্বলতাই হয়ত সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে দেশে তাঁকে বাকশাল গঠন করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
“মানুষেরে ধোঁকা আমি দিতে পারব না”- চোখের পানিতে এই প্রতিজ্ঞা যিনি করেছিলেন, বাংলার মানুষের জন্য যিনি জেল খানায় পার করেছেন অর্ধেক সময়, বাংলার মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে গোপালগঞ্জের কিশোর শেখ মুজিব যখন ধীরে ধীরে বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠছেন, ঠিক তখনই সমাপ্ত হল তাঁর – অসমাপ্ত আত্মজীবনী। আর তাঁর আত্মজীবনীর মতো জীবনটাকেও অসমাপ্ত করে দিল এই বাংলারই কিছু মানুষ

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *