আজ রবিবার, ৬ই শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ২১শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

নজরদারিতে হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক

স্টাফ রিপোর্টার :
শহর কিংবা শহরতলী, ছোট্ট এই জেলার সর্বত্রই গড়ে উঠেছে নামে-বেনামে নানা হাসপাতাল ও ক্লিনিক। এসকল প্রতিষ্ঠান ঘিরে আবার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ব্যবসাও বেশ জমজমাট নারায়ণগঞ্জে। কমিশন বাণিজ্যের কারণে কিছু সংখ্যক চিকিৎসক থেকে শুরু করে দালালরাও হাতিয়ে নিচ্ছেন রোগীদের সর্বস্ব। অসাধু এই চক্রের খপ্পরে পরে কেবল পকেট কাটাই নয় বরং ভুল চিকিৎসার বলিও হচ্ছেন অনেকে। এ নিয়ে রোগীদের অভিযোগ অনুযোগের কমতি না থাকলেও লাগাম টানা যাচ্ছিল না। এবার হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে রজর দিয়েছে দুদক। গত ৬ জুন নারায়ণগঞ্জে দুদকের গণশুনানিতে বিষয়গুলো উত্থাপিত হলে তা আমলে নেন দুদক কর্মকর্তারা। ইতিমধ্যেই গতকাল শহরের খানপুরে নোভা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান চালিয়েছে দুদক। এতে দালালদের মাধ্যমে ডাক্তারের টেষ্ট বাণিজ্যের প্রাথমিক সত্যতাও পেয়েছে তারা।
সচেতন মহল বলছেন, কেবল নোভা ডায়াগনস্টিকই নয় বরং প্রতিটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে অভিযান চালালেই মিলবে টেষ্ট বাণিজ্যের এমন অজস্র প্রমাণ। বিশেষ করে, ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট সরকারী হাসপাতাল ঘিরে নগরীর খানপুর এলাকা এবং ১০০ শয্যা বিশিষ্ট ভিক্টোরিয়া সরকারী হাসপাতাল ঘিরে শহরের মন্ডলপাড়া এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য ডায়াগনস্টিক সেন্টার। যেখানে পরীক্ষার নামে রোগীদের পকেট খালি করে এর কমিশন পেয়ে থাকেন দালাল ও চিকিৎসকরা। এসকল ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে বিভিন্ন সময়ে ভুল রিপোর্ট দেয়ার নজিরও দেখা গেছে। এছাড়াও আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে পরিচালিত হওয়া হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর অধিকাংশেরই লাইসেন্স এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেই। এরপরও কোন উপায়ে চলছে এই প্রতিষ্ঠানগুলো- তা নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে।
দুদকের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত হাসপাতাল ক্লিনিক এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর প্রতি নজর রয়েছে তাদের। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত চলছে। এই তদন্তের অংশ হিসেবে গতকাল খানপুরের নোভা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান চালায় দুদক।
অভিযানের নেতৃত্ব দেয়া দুর্নীতি দমন কমিশন সমন্বিত জেলা কার্যালয়, নারায়ণগঞ্জ এর উপ পরিচালক মঈনুল হাসান রওশনী জানান, ‘গত ৬ জুন নারায়ণগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত দুদকের গনশুনানিতে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অব্যবস্থাপনা, দালালদের মাধ্যমে বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকে ডাক্তারদের টেষ্ট বাণিজ্যসহ নানা অভিযোগ উত্থাপিত হয়। গনশুনানিতে সেবাদাতারা অভিযোগ করেন নোভা ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ডাক্তার অলক কুমার সাহার বিরুদ্ধে। তখন গণশুনানিতে উপস্থিত প্রধান অতিথি দুদকের কমিশনার (তদন্ত) মো. জহুরুল হক বিষয়টি খতিয়ে দেখার কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। সেই নির্দেশনা ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আজ বুধবার নোভা ডায়ানস্টিক সেন্টারে অভিযান পরিচালনা করা হয়। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে দুদকের বিশেষ নজর রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে দুদকের নজরদারীর খবরে নড়েচড়ে বসেছে দালাল ও অসাধু চিকিৎসক এবং মালিকপক্ষ। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের মাঝে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে বলে সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে, নারায়ণগঞ্জের সরকারি দুই হাসপাতালে অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ শোনা যায় প্রায় সময়ই। রোগিদের সঠিক সেবা না মেলার অভিযোগও উঠে হরহামেশা। এমনকি একটি হাসপাতাল থেকে সরকারি ঔষধ বাহিরে বিক্রির খবর প্রকাশের পর এর প্রমাণও মিলেছে ঔষধ প্রশাসনের তদন্তে। এছাড়াও হাসপাতালে চিকিৎসকদের উদাসীনতায় ঝুঁকিপূর্ন রোগিদের ইনজেকশন পুশ থেকে শুরু করে নানা চিকিৎসা প্রদানে দেখা যায় বহিরাগত দালাল, ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারি এবং আয়াদের। এসকল অনিয়ম দুর্নীতি রোধ করে কাঙ্খিত সেবা নিশ্চিত করণে কর্তৃপক্ষের বিশেষ নজরদারী জোরদার করার আহবান সচেতন মহলের। পাশাপাশি কুশিলবদের আইনের আওতায় আনার জন্য দুদকের নজরদারীও কামনা করছেন সচেতন মহল।
জানা গেছে, শিল্পাঞ্চল অধ্যুষিত এই জেলায় জীবন-জীবীকার তাগিদে দেশের প্রতিটি জেলার মানুষের বসবাস রয়েছে। বিশেষ করে, নারায়ণগঞ্জ শহর, ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জে মানুষের বসবাস সবচেয়ে বেশি। বিপুল পরিমান এই মানুষের স্বাস্থ্যসেবার জন্য নারায়ণগঞ্জ শহরে দুটি সরকারী হাসপতাল রয়েছে। একটি নগরীর খানপুর এলাকায় অবস্থিত ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল আরেকটি নগরীর মন্ডলপাড়া এলাকায় অবস্থিত ১০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল। যা ভিক্টোরিয়া হাসপাতাল নামে সর্বাধিক পরিচিত।
এই দুই হাসপাতালে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিনিয়তই সাধারণ মানুষ সরকারী চিকিৎসা সেবা নিতে আসেন। তবে হাসপাতাল দুটিকে কব্জা করে রেখেছে বহিরাগত দালাল চক্র। সরকারি চিকিৎসা সেবা নিতে আসা রোগী এবং তাদের স্বজনরা দালালদের হাতে জিম্মি থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
দালালদের ঔদ্ধত্বপূর্ন আচরণ থেকে রেহায় পায়নি গণমাধ্যম কর্মীরাও। অনিয়মের তথ্য সংগ্রহ করতে ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী দালাল চক্র দ্বারা লাঞ্ছিত হয়েছে। ইতিপূর্বে খানপুর ও ভিক্টোরীয়া হাসপাতালে একাধিকবার অভিযান চালিয়ে দালালচক্রের বেশ কয়েকজন সক্রিয় সদস্যদের গ্রেফতারও করেছিল র‌্যাব। এরপরও দালালমুক্ত হয়নি হাসপাতাল দুটি। এর নেপথ্যে অনেকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দুষছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, চিকিৎসক ও নার্সদের সাথে দালালদের গভীর সখ্যতা রয়েছে বলেও শোনা গেছে।

স্পন্সরেড আর্টিকেলঃ