১৫ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, বুধবার, সকাল ৬:১৫

কৃপণ ধনীদের শিখার আছে

নিজস্ব সংবাদদাতা:

পশ্চিম তল্লার বাইতুস সালাত জামে মসজিদে ভয়াবহ বিস্ফোরণে নিহতের মধ্যে একজন হলে ফটো সাংবাদিক নাদিম আহমেদ। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ছিলেন তিনি। এ পরিবারসহ সব ক’টি পরিবারের সাহায্যার্থে এগিয়ে এসেছেন কেউ কেউ। তবে গতকাল মহানুভবতার এক দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন চাষাঢ়ার কয়েকজন চা এর দোকানি। তারা সবাই মিলে ১১ হাজার টাকা তুলে দিয়েছেন নাদিমের স্ত্রী ও সন্তানের হাতে। যা শুনে সচেতন মহল বলেছেন, এ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে শিখার আছে এ শহরের কৃপণ ধনীদের।

নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ এলাকার একজন শিল্পপতির নামের আগে সম্রাট বলা হয়। কোন এক সম্রাটের নামের সাথে মিল থাকায় এমন উপাধি বলে জানান শহরের কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তি। তারা আরও জানান, পতিতালয়ে মদের দোকান দিয়ে উত্থান হলেও চট্টগ্রামের এক ব্যবসায়ীর সাথে এদিক সেদিক করে অঢেল টাকার মালিক হন তিনি। তবে নামে সম্রাট যোগ হলেও মনের দিক দিয়ে তা বনতে পারেননি তিনি। ঘনিষ্ঠজন ও পরিচিজনরা জানান, ওই ধনীকে কাউকে দান খয়রাত করেছেন এমনটা তারা দেখেননি। তবে তার সুবাদে তার ভাইয়েরাও ধনী হয়েছেন।

পরিবহণ খাতের গডফাদার হিসেবে পরিচিতি রয়েছে দেওভোগ এলাকার দুই ভাইয়ের। এ শহরে তাদের খাদেম নামেও ডাকে কেউ কেউ। পরিবহণ খাত লুটপাট করে অঢেল টাকার মালিক হলেও শহরে তারা কৃপণ বলে পরিচিত। যদিও পরিবহণ সেক্টরের অন্যরা জানালেন, সন্ধ্যার পর ভিন্ন রকম অনুষ্ঠানে খাসী ভোজ দিয়ে থাকেন এক খাদেম। সেখানে টুং টাং শব্দও হয় বলে জানান তারা।

হরেক রকম ব্যবসা রয়েছে শহরের জামতলার বাসিন্দা এক শিল্পপতির। পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া অনেক সম্পদেরও মালিক তিনি। সংসারে খাওয়া পড়ার তেমন কেউ নেই। যারা আছেন তাদের জন্য খুব বেশী সম্পদ রেখে গেলেও তা দেখ ভাল’র করার মতো ক্ষমতা নেই। এরপরও কৃপণতা কাকে বলে তার অন্যতম উদাহরণ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন ওই শিল্পপতি। নিজেকে শিক্ষানুরাগী হিসেবে জাহির করতে চাইলেও অনেকের মতে, তিনি আপদমস্তক শিক্ষা ব্যবসায়ী। তবে তামাক সংশ্লিষ্ট ব্যবসাও করেন সদা ছিমছাম গড়নের এই ধর্নাঢ্য ব্যক্তি।

তারা ছাড়াও এ শহরে এমন অনেক ধনী আছেন যাদের সম্পদের হিসেব বের করা দক্ষ হিসাব রক্ষকের জন্যও কঠিন কাজ হবে। একাধিক বাড়ি-গাড়ি, ফ্ল্যাট-সম্পত্তি, ব্যবসা বাণিজ্য, ব্যাংক ব্যালেন্স- কোন কিছুর অভাব নেই তাদের। তাদের মধ্যে অনেকে পৈত্রিক সূত্রে পেয়েছেন, কেউ আবার তা বাড়িয়েছেন কেউবা একেবারে ছা-পোষা থেকে শুরু করে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। তবে এ শহরের দিকে তাদের তেমন নজর নেই। তারা চিন্তায় মশগুল কিভাবে আরও সম্পদ বাড়ানো যায়। এমন চিন্তার কারনে তাদের মধ্যে কেউ কেউ সংসারের দিকেও বেশী নজর দিতে পারেন না বলে জানা গেছে। এতে করে কারও কারও সন্তান ইতিমধ্যে বখাটে দলে যোগ দিয়েছে। কেউ দিনে হাজার হাজার টাকার নেশা করেন। কেউবা অন্যভাবে খরচ করেন।

সচেতন মহলের মতে, সম্পদের পাহাড় যারা গড়েছেন তারা নানা কৌশল ও কষ্টে গড়েছেন। কেউ হয়তো হঠাৎ কলাগাছ ফুলে আঙ্গুল হয়েছেন। তবে সে সম্পদের যে সবার অধিকার আছে তা তারা ভুলে গেছেন। তাই দান, যাকাত, এমনকি সরকারি করও ফাঁকি দেন তারা। বেশীরভাগ ধনী নিজেদের ভোগ বিলাসের জন্য সম্পদ রেখে যান যাতে ভবিষ্যত বংশধররা স্বচ্ছল অবস্থায় থাকে। অবশ্য এর ব্যতিক্রমও আছেন। পশ্চিম তল্লায় মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় মডেল গ্রুপের মালিক মাসুদুর রহমান যেভাবে সহযোগীতার হাত বাড়িয়েছেন তা অন্য শিল্পপতিদের বেলায় দেখা যায়নি। এই ব্যক্তিকে বিভিন্ন সময়ে এমন দান করতে দেখা গেছে বলে জানান  নগরের অনেকে।

এদিকে পশ্চিম তল্লার বাইতুস সালাত জামে মসজিদে ভয়াবহ বিস্ফোরণে নিহত ফটো সাংবাদিক নাদিম আহমেদের স্ত্রী ও ছেলের হাতে নগদ এগারো হাজার টাকা তুলে দেন চাষাঢ়াস্থ নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রিয় শহীদ মিনারের পাশের চায়ের দোকানিরা। এসময় উপস্থিত চা বিক্রেতা আবুল কালাম আজাদ ফটো সাংবাদিক নাদিমের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পরেন। তিনি বলেন, নাদিম ভাই একজন নামাজি ব্যক্তি ও অনেক ভালো মানুষ ছিলেন। সবসময় আমাদের সাথে হাসি দিয়ে কথা বলতেন।  তার সাথে আমাদের আত্মার সম্পর্ক ছিল। তাকে হারানোর ব্যাথা কোন ভাবেই আমরা মেনে নিতে পারছি না। এসময় আরোও উপস্থিত ছিলেন, চা দোকানী আমির আলী, হোসেন আলী, আবুল কালাম। এ সহযোগীতার জন্য তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন নিহত নাদিম আহমেদের স্ত্রী লিমা আহমেদ ও নবম শ্রেণী পড়ুয়া ছেলে নাফি আহমেদ।

এ খবর শোনার পর শহরে বেশ আলোচনা হয়েছে। অনেকেই বলেছেন অসহায় পরিবারগুলোর জন্য মডেল গ্রুপের মাসুদুর রহমান ছাড়া আর কোন শিল্পপতি এগিয়ে এলেন না। এ শহরেতো ধনীর সংখ্যা কম নয়। দেশের সবচেয়ে ধনী জেলায় ধনীরা এত কৃপণ কেন এমন কথাও উঠেছে।

উল্লেখ্য, ৪ সেপ্টেম্বর এশা’ নামাজের সময়ে ফতুল্লার পশ্চিম তল্লায় ওই মসজিদে ভয়াবহ বিস্ফোরণে ৩৭ জন দ্বগ্ধ হয়। এ ঘটনায় এ পর্যন্ত ৩১ জন মারা গেছেন। তাদের মধ্যে ফটো সাংবাদিক নাদিম আহমেদ রয়েছেন।

স্পন্সরেড আর্টিকেলঃ