১২ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৭শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, শুক্রবার, রাত ১০:৩৪

করোনায় উৎসাহী জনতার কর্মকান্ড

অদৃশ্য শক্তি করোনা ভাইরাসের তান্ডবে বর্তমানে আমাদের দেশ ও বিশ্ব পঙ্গু হতে চলেছে। দিন যাচ্ছে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা আর মৃত্যু। চারিদিকে শুধু লাশ আর লাশ। এ যেনো কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লার বাতাসে লাশের গন্ধ কবিতার ‘আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই” লাইনটির পুনরাবৃত্তি ঘটছে। সেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও ৭৪’র দুর্ভিক্ষের ক্রান্তিকালের কথা আমাদের স্মরণ করে দিচ্ছে করোনা।

চোখ খুললেই দেখা যায়, কেউ একবেলার খাবারের সন্ধান পেলেও আরেক বেলা বা অন্য একটি দিনের খাবারের সন্ধান পাচ্ছে না। কেউ আধা কেজি চালের জন্য দীর্ঘ মাইল হেটে চলছে, আবার সে চাল পেয়ে ক্ষুদার্ত অবস্থায় জ্ঞান হারিয়ে রাস্তায় পরে আছে। কেউ খাবার খেতে খেতে অনেক কষ্ট করেও আরও একটু খাওয়ার চেষ্টায় মগ্ন রয়েছে। এদিকে কেউ ত্রাণের চাল, ডাল, তেল চুরি করে নিজের গুদাম ভারী করছে। এ যেন অন্য এক পৃথিবিতে আমাদের বসবাস। এ গ্রহ মনে হচ্ছে মানুষের জন্য নয়। জীব জন্তুর গ্রহতে আমরা বেঁচে আছি। সামনে আরও ভয়াবহ দিন অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।

বিশ্বের বিখ্যাত বিজ্ঞানীরা মনে করছেন কোভিড-১৯ অর্থ্যাৎ করোনা ভাইরাসের চিকিৎসা বা ভ্যাকসিন কোনটাই তৈরি করা সহজসাধ্য নয়। রোগটির প্রতিশেধক তৈরি করতে তারা বারংবার ব্যর্থ হচ্ছে। যে জায়গায় উন্নত দেশগুলো হুমড়ি খাচ্ছে সেখানে আমরা তো সামান্য জাতি। আমরা কি করবো? আমাদের উচিৎ একটু মানুষের মত মানুষ হওয়ার। নিজের মধ্যে যে একজন মানুষের মন বসবাস করেছে তা প্রকাশ করার। আমাদের এই একঘেয়ামি ও স্বার্থপরতার কি হবে? যদি দু’দিন পর আমরাই না বেঁচে থাকি!

যারা এই ক্রান্তিকালে নিজেদের গুদাম ভারী করছি কতদিন খাবে তারা এই চাল, ডাল ও তৈল? এর উত্তর আমাদের সময়ই বলে দেবে।

এসময়ে কিছু জনতার কথা না বললেই নয়। সমাজের মাদকসেবী, বখাটে , ধর্ষক, মাতবররা অনেক ধার্মিক হয়ে গেছেন। তারা এখন মসজিদ ছাড়া নামাজই পড়তে পারে না। সরকার ও চিকিৎসকদের পরামর্শ সামাজিক দুরুত্ব বজায় রেখে চলার জন্য। কিন্তু যারা কখনও মসজিদে গিয়ে নামাজ তো দূরের কথা কখনো মসজিদের ধারে কাছেও যায়নি তারা আজ মসজিদে গিয়ে একত্রিত হয়ে নামাজ পড়ছে। আর কে কি করলো, কোথা থেকে কি আসলো এ নিয়ে মিটিং করছে।

করোনার পরিস্থিতি জানতে চায়ের দোকানে একটি সিগারেট ও চা নিয়ে বেশ আড্ডায় মগ্ন আমাদের উৎসাহী জনতা। সমাজের কিছু তরুন আছে যারা অতি উৎসাহী সমাজসেবক হিসেবে নিজেকে জাহির করছে। তারা মানুষকে সামাজিক দুরুত্ব বজায় রাখার নির্দেশনা দিচ্ছেন। আর আদেশ কেউ অমান্য করলে সাথে সাথে লাঠির বাড়ি, কলার ধরা, কিলঘুষি দিয়ে তারা বড্ড খুশি। তাদের দাপটে প্রতিনিয়ত হামলার শিকার হচ্ছে অনেক সাংবাদিক, ডাক্তার ও নার্স।

তাদের এই ক্ষমতা কে দিয়েছে সাধারণ মানুষের গায়ে হাত তোলার?। এ বিষয়ে কোন এক থানার ওসির সাথে আলাপ হয়েছিলো। তিনি বলছিলেন, ভাই তাদের কথা আর কি বলবো, তারা যদি পুলিশের চাকরী পেতো তাহলে তো সবাইকে গুলি করে মারতো।

আরেকটি কাজ করছে কিছু উৎসাহী জনতা ও সমাজের বিত্তবান মানুষ। তাদের এহেন কান্ড আমাকে রীতিমত পাগল করে তুলছে। ত্রাণ ও দান যাই বলি, কাউকে দিয়ে বলছে ভাই একটা ছবি তুলি?

দান করছে ৫০ জনকে আর বিশাল করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট ও  গণমাধ্যমে প্রকাশ করে বলছে ৫০০ জনকে দিয়েছেন। কেউ আবার ছবি তোলার জন্য ত্রান/দান করছে। দুই জনের ছবি তোলা শেষ হলেই স্থান ত্যাগ করে প্রচার করছে অমুক এলাকার ১ হাজার পরিবারের মাঝে খাদ্য সামগ্রী প্রদান করা হয়েছে।

ইসলাম ধর্মে আছে যদি করো কাউকে দান, তা যেন শুধু আল্লাহ দেখতে পান। কিন্তু কি আর করার ছবিতো তাদের তুলতেই হবে। নাহলে তো মানুষ বলবে না হাজী সাহেব বা অমুক সাহেব দানশীল!

আবার কিছু মানুষ সরকারি ত্রাণ নিজের হাতে দিয়ে বলছে, আমার ব্যক্তিগত দান সকলে নিয়ে যান কেউ না খেয়ে থাকবেন না।

বিশ্বের এই পরিস্থিতিতে আমাদের অতি উৎসাহী হতে হবে ভাল কাজে। যে কাজের ফলে মানুষ কষ্ট করে খোঁজ নিয়ে আপনার কথা মনে রাখবে। আমরা যদি ভাল একটি মন নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াই দেখবেন সে মানুষগুলো ও পুরো সমাজ আপনার পাশে দাঁড়াবে। আমাদের সকলের উচিৎ সামাজিক দুরুত্ব ও শারীরিক নিরাপত্তা বজায় রেখে মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো।

লেখকঃ  মোহাম্মদ শিপন মীর

নিজস্ব প্রতিবেদক, দৈনিক সংবাদচর্চা

স্পন্সরেড আর্টিকেলঃ